ল্যামার্ক মতবাদ বা ল্যামার্কিজম (Lamarckism)
ফরাসী প্রকৃতি বিজ্ঞানী Jcan Baptist Lamarck (১৭৪৪-১৮২৯), ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে ফিলােসফিক জুলজিক (Philosophic Zoologique) গ্রন্থে অর্জিত বৈশিষ্ট্যের বংশগতি (theory of inheritance of acquired character) নামক বিবর্তন সম্পর্কীত মতবাদ প্রকাশ করেন।
ল্যামার্কের মতবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলাে, পরিবেশের প্রভাবের ফলেই বিবর্তন সংঘটিত হতে পারে। পরিবেশের প্রভাবে জীবের দৈহিক গঠনের পরিবর্তন হয়। তাঁর মতে বিবর্তন কতিপয় রীতি-নীতি মেনে চলে। এই রীতি-নীতিগুলােই বিবর্তনের ক্রম ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে। ল্যামার্ক তাঁর বিবর্তন তত্ত্বেও এ রীতি-নীতিগুলােই ব্যাখ্যা করেছেন।

ল্যামার্ক এর সূত্র
আধুনিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে Dodson, 1960 ল্যামার্কের একজন বিশিষ্ট সমর্থক। Dodson ল্যামার্কাদকে চারটি সূত্রে ব্যাখ্যা করেছেন যা ল্যামাকীয় সুত্র বলেও পরিচিত।
ল্যামার্কের ১ম সূত্র
জীবদেহ এবং দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আকারে ক্রমবর্ধিত হওয়ার একটি লক্ষণ সর্বদাই পরিলক্ষিত হয়।
ল্যামার্কের ২য় সূত্র
জীবন ধারণের প্রয়ােজনে কোন নতুন চাহিদা এবং এ চাহিদার ফলে জীবন অভ্যাসের যে পরিবর্তন হয় তার ফলেই নতুন প্রত্যঙ্গের উৎপত্তি হয়।
ল্যামার্কের ৩য় সূত্র
কোন একটি অঙ্গ প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হলে তা উন্নত এবং সুগঠিত হয়, কিন্তু ব্যবহৃত না হলে ক্রমান্বয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে অবশেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এ সুত্রটি ব্যবহার ও অব্যবহারের সূত্র নামে পরিচিত।
ল্যামার্কের ৪র্থ সূত্র
কোন একটি জীবের দেহে উন্নতি বা ক্ষয়প্রাপ্তির মাধ্যমে যে সকল পরিবর্তন সাধিত হয় তা অর্জিত বৈশিষ্ট্যরূপে অঙ্গীভূত হয় এবং পরবর্তী প্রজন্মে (Generation) সঞ্চারিত ও বিকশিত হয়। এ সূত্রটি অর্জিত বৈশিষ্ট্য সঞ্চারণের সূত্র(Law of inhertance of acquired character) নামে পরিচিত।
ল্যামার্কিজম এর সমালোচনা
কোনাে জীবের দেহে পরিবেশের প্রভাবে বা প্রাকৃতিক অভিঘাতের ফলে যে রূপান্তর সংঘটিত হয় তাহা প্রজন্ম হতে প্রজন্ম বংশানুক্রমে সঞ্চারিত ও বিকশিত হয়ে নতুন প্রত্যঙ্গে পরিণত হয়। বিভিন্ন আলােচনা ও সমালােচনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, ল্যামার্কের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সূত্রে কিছুটা সত্য নিহিত আছে।
উদাহরণস্বরূপ, অব্যবহারজনিত বিলুপ্তির উদাহরণ পাওয়া যায় সাপের উপাঙ্গে যা গর্তে প্রবেশের সময় ভূমির সাথে ঘর্ষণ এবং দীর্ঘ দিনের অব্যবহারের ফলে কালক্রমে বিলুপ্ত হয়েছে। উট পাখির পূর্ব পুরুষেরা উড়তে পারতাে কিন্তু বংশানুক্রমে দীর্ঘদিন ডানা ব্যবহার না করার ফলে তা নিষ্ক্রিয় অঙ্গে পরিণত হয়েছে।
প্রতিনিয়ত ব্যবহারের ফলে অঙ্গ উন্নত ও সুগঠিত হয়। যেমন- কর্মকার, ব্যায়ামবিদ, দৌড়বিদ প্রভৃতি মানুষের পেশি খুব সুগঠিত। ল্যামার্ক মনে করেন যে, প্রাচীনকালে জিরাফের সামনের পা ও গ্রীবা লম্বা ছিল না। পরবর্তী কালে ব্যবহারিক প্রয়ােজনে জিরাফের পা ও গ্রীবা প্রলম্বিত হয়েছে।
স্থলভাগে চারণযােগ্য ভূমির অভাব অনুভূত হওয়ায় জিরাফের হরিণাকৃতি পূর্ব পুরুষেরা গাছের পাতা ভক্ষণ করতে আরম্ভ করে। এর জন্য তাদের সামনের পায়ে ভর দিতে এবং গ্রীবা উত্তোলন করতে হতাে। ক্রমান্বয়ে বৃক্ষ শীর্ষস্থিত পাতাগুলাে ভক্ষণের জন্য অগ্র পায়ের অধিক ব্যবহার এবং গ্রীবা উত্তোলন ও প্রসারণের ফলে বংশানুক্রমে প্রলম্বিত হতে হতে এরা বর্তমান রূপ ধারণ করেছে।