- ডারউইন মতবাদ বা ডারউইনিজম (Darwinism)
- ডারউইন মতবাদ বর্ণনা
- ১। অত্যধিক বংশ বৃদ্ধির হার (Prodigality of production)
- ২। স্থান ও খাদ্যের সীমাবদ্ধতা (Limitation of Food and Space)
- ৩। জীবন ধারণের জন্য সংগ্রাম (struggle for existence)
- ৪। প্রকরণ (Variation)
- ৫। প্রাকৃতিক নির্বাচন বা যােগ্যতমের উর্দ্ধতন (Natural Selection or Survival of the Fittest)
- ৬। উত্তরলব্ধি ও নতুন প্রজাতির উৎপত্তি (Inheritance and Origin of New Species)
- ডারউইনিজম মতবাদের সমালােচনা
ডারউইন মতবাদ বা ডারউইনিজম (Darwinism)
ইংরেজ প্রকৃতিবিদ চার্লস রবার্ট ডরইউন (১৮০৯-১৮২২) ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবী প্রদক্ষিণরত HMS Beagle জাহাজে প্রকৃতিবিদের অবৈতনিক চাকরি নিয়ে কেপ, ডান্ডি, আটলান্টিক দ্বীপপুঞ্জ, তাহিতি,নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, তাসমানিয়া মালদ্বীপ, মরিসাস, সেন্ট হেলেনা, ব্রাজিল, গ্যালাপ্যাগােস দ্বীপপুঞ্জ প্রভৃতি স্থানে পাঁচ বছর (২৭ ডিসেম্বর ১৮৩১ থেকে ২ অক্টোবর ১৮৩৬) কালব্যাপী ভ্রমণ শেষে জৈব বিবর্তন এবং প্রাণীসমূহের ভেতর সাদৃশ্য ও সম্পর্ক বিষয়ে বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ করেন।
পরবর্তী প্রায় ১৫ বছর তিনি এসব উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করেন। এ সময়েই ম্যালথাস এর জনসংখ্যা সম্পর্কীত প্রবন্ধ পাঠ করে প্রাকৃতিক সংঘাত কিভাবে প্রাণীসমূহের স্থায়িত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে তিনি সে সম্বন্ধে অবহিত হন। এরই এক পর্যায়ে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (১৮২৩-১৯১৩) ডারইউন এর সাথে অভিন্ন মত প্রকাশ করেন।
অতঃপর জিওলজিস্ট লায়েল ও উদ্ভিদবিদ হুকার বন্ধুদ্বয়ের পরামর্শ অনুযায়ী ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ১লা জুলাই প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা প্রজাতির উৎপত্তি নামক মতবাদটি লন্ডনের লিনিয়ান সােসাইটির সভায় প্রকাশ করেন। ডারউইনের তত্ত্ব বা ডারউইন ওয়ালেস তত্ত্ব প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব নামে পরিচিত।

ডারউইন মতবাদ বর্ণনা
১। অত্যধিক বংশ বৃদ্ধির হার (Prodigality of production)
প্রত্যেক জীবে জ্যামিতিক হারে বংশ বৃদ্ধির একটা প্রবণতা দেখা যায়। এককোষী জীব প্যারামেসিয়াম বছরে প্রায় ৬০০ বার জনন কার্য সম্পন্ন করে। এই ক্ষুদ্র প্যারামেসিয়াম এর সকল বংশধর বেঁচে থাকলে পৃথিবী ভরে যেত।
ডারউইন হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, প্রতি জোড়া হাতি দম্পতি যারা ৯০ বৎসরের জীবনকালে একটি করে মাত্র ৬ বার বাচ্চা দেয়, যদি সবগুলাে বাচ্চা বেঁচে থাকতাে এবং প্রতিটি স্ত্রী শাবক বেঁচে থেকে অনুরূপভাবে বংশ বৃদ্ধি করতাে তবে ৭৫০ বছরে প্রায় ১ কোটি ৯০ লক্ষ হাতি হতাে। কিন্তু তা হয়না। প্রজাতির সংখ্যা মােটামুটি অপরিবর্তিত থাকে।
২। স্থান ও খাদ্যের সীমাবদ্ধতা (Limitation of Food and Space)
যে হারে জীব উৎপন্ন হয় সে অনুপাতে পৃথিবীতে স্থান ও খাদ্য নেই। এ অবস্থায় ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত জীব উৎখাত করতে একাধিক প্রভাব বিজড়িত হয়ে পড়ে।
৩। জীবন ধারণের জন্য সংগ্রাম (struggle for existence)
ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি জীব উৎপন্ন হওয়ায় অস্তিত্ব বজায় রাখার নিমিত্তে খাদ্য, স্থান প্রভৃতির জন্য সংগ্রাম অনিবার্য হয়ে উঠে। এ সংগ্রাম তিন ধরনের। যথা-
ক.অন্ত:প্রজাতিক সংগ্রাম (Intraspecific struggle)
একই প্রজাতির জীবের মধ্যে খাদ্য, আশ্রয়, প্রজনন, ভূমি ইত্যাদির জন্য সংগ্রামকেই অন্তঃপ্রজাতিক সংগ্রাম বলে।
খ. আন্তঃপ্রজাতিক সংগ্রাম (Interspecific struggle)
ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির জীবের মধ্যে সংগ্রামকে বুঝায়। এই সংগ্রামে সম্পর্কটি সাধারণত খাদ্য ও খাদকের মধ্যে বিরাজমান।
গ. পরিবেশগত সংগ্রাম(Environmental stuggle)
জীবের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পরিবেশের সাথে (যেমন- খরা, প্লাবন, শীত, ঝড়, বৃষ্টি প্রভৃতি) সংগ্রামকে বুঝায়।
৪। প্রকরণ (Variation)
পৃথিবীতে কোন দুইটি জীব হুবহু একরূপ নয়। একই প্রজাতির জীবের মধ্যে, এমনকি একই পিতা-মাতার সন্তান-সন্ততির মধ্যে প্রকরণ বা ভেদ দেখা যায়। প্রজননের মাধ্যমে এই প্রকরণ সন্তান-সন্ততিতে সঞ্চারিত হয়। অর্থাৎ সংগ্রামের ফলে অভিযােজনজাত প্রকরণ বংশানুক্রমে পরিচালিত হয়ে অবশেষে জীবের বৈশিষ্ট্যরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
ডারউইনের মতে সামান্য ধারাবাহিক প্রকরণই ভিন্ন ভিন্ন জীব উৎপত্তির জন্য দায়ী।
৫। প্রাকৃতিক নির্বাচন বা যােগ্যতমের উর্দ্ধতন (Natural Selection or Survival of the Fittest)
ডারউইনের মতে জীবন ধারণের সংগ্রামে কেবল সেই জীব সাফল্য লাভ করে যাদের দেহে সংগ্রামের পক্ষে অনুকূলে এবং অধিকতর ও সঙ্গত সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিযােজন বা প্রকরণ থাকে।
যে সকল জীবের অভিযােজন বা প্রকরণ সংগ্রাম উত্তরণের উপযােগী নহে তারা পৃথিবী হতে বিলীন হয়ে যায়। ডারউইন একে প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection) বলে অভিহিত করেছেন। Herbert Spencer একে যােগ্যতমের উদ্ধর্তন (survival of the fittest) হিসেবে অ্যাখায়িত করেছেন।
৬। উত্তরলব্ধি ও নতুন প্রজাতির উৎপত্তি (Inheritance and Origin of New Species)
সুবিধাজনক প্রকরণসমূহ প্রাকৃতিক নির্বাচনে উৰ্ত্তীণ হয়ে তারা সন্তান-সন্ততিতে সঞ্চারিত হয়। সন্তান-সন্ততির আরাে প্রকরণের ফলে জনু থেকে জনুতে ক্রমান্বয়ে জীবের বৈশিষ্ট্যের রূপান্তর ঘটে। এভাবে অনেক জনুর পর সামান্য প্রকরণগুলাে সঞ্চিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যরূপে দেখা যায়। ফলে নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়।
ডারউইনিজম মতবাদের সমালােচনা
বিবর্তনের ক্ষেত্রে ডারউইনের মতবাদ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী সাড়া জাগানাে অবদান। বিশ্বব্যাপী সমর্থিত হলেও মতবাদটি সর্বজন স্বীকৃত নয়। কারণ- এ মতবাদে যেমন কতকগুলাে যৌক্তিক ও প্রশংসনীয় দিক রয়েছে তেমন কতকগুলাে অযৌক্তিক দিকও রয়েছে। নিম্নে যৌক্তিক ও অযৌক্তিক দিকগুলাে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলাে-
ডারউইন মতবাদের যৌক্তিক দিকঃ
- ডারউইন মতবাদের মূল বক্তব্যগুলাে অনেকাংশেই বাস্তব ও যৌক্তিক। বিবর্তনের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এখন পর্যন্ত যে সকল প্রমাণ পাওয়া গেছে তা ডারউইনবাদের সমার্থক।
- অতীতের অনেক বৃহদাকার জীব জীবন সংগ্রামে ব্যক্ত হয়ে প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। অভিযােজনে ব্যর্থ অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদের বিলুপ্তি ডারউইনবাদের পক্ষে কথা বলে।
- প্রকৃতিতে একই প্রজাতির দুটি জীব হুবহু এক রকম নয়। এটি প্রকৃতিতে প্রকরণের উপস্থিতি প্রমাণ দেয়।
ডারউইন মতবাদের অযৌক্তিক দিক
- জীবন সংগ্রামে যােগ্যতমের জয়ের কথা বলা হয়েছে কিন্তু কিভাবে উপযুক্ত প্রকরণের উদ্ভব হয় তা বলা হয়নি।
- জীবজগতের সকল নির্বাচন প্রাকৃতিক নির্বাচন নয়। প্রাকৃতিক নির্বাচন কোনাে জীবদেহে নিস্ক্রিয় অঙ্গের উপস্থিতি ব্যাখ্যা করতে অপারগ। ডারউইন যেকোনাে ধরনের প্রকরণ বা পরিবৃত্তিকে বংশগত মনে করতেন।
- কিন্তু আমরা জানি কেবল জনন কোষের সংগঠিত প্রকরণগুলােই বংশানুসরণযােগ্য।
- একই প্রজাতির বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে যে সামান্য পার্থক্য দেখা যায় তার ভিত্তিতে নতুন প্রজাতি সৃষ্টির সম্ভাবনা খুবই কম।