রজ:চক্র কী? রজ:চক্র এর ধাপগুলোর বর্ণনা।

রজ:চক্র কী?

বয়োপ্রাপ্ত নারীর সমগ্র যৌনজীবনে প্রায় নিয়মিত, গড়ে ২৮ দিন (২৪-৩২ দিন) পরপর জরায়ু থেকে রক্ত, মিউকাস, এন্ডোমেট্রিয়ামের ভগ্নাংশ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অনিষিক্ত ডিম্বাণুর চক্রীয় নিষ্কাশনকে রজঃচক্র বলে।

রজ:চক্র এর ধাপগুলোর বর্ণনা

গোনাডোট্রফিক হরমোন (GTH)-এর প্রভাবে ১২-১৫ বয়সে এ চক্রের সূত্রপাত ঘটে এবং ৪৫-৫০ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। রজঃচক্রকালে জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম (অন্তঃস্তর) এর পরিবর্তনের উপর ভিত্তি করে রজঃচক্রকে নিচে বর্ণিত ৪টি পর্বে ভাগ করা হয়ে থাকে।

১। নিরাময় পর্ব:

বিগত রজঃচক্র শেষ হওয়ার সংগে সংগে পরবর্তী চক্রের প্রারম্ভে জরায়ুতে যে প্রক্রিয়ায় পুনর্গঠনমূলক কাজ শেষে এন্ডোমেট্রিয়াম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তাকে নিরাময় পর্ব বলে। এর স্থায়িত্বকাল রজঃস্রাব শুরুর তিন দিন পর থেকে ষষ্ঠ দিন পর্যন্ত। এসময় সম্মুখ পিট্যুইটারি গ্রন্থি থেকে FSH (ফলিক্স স্টিমুলেটিং হরমোন) ও LH (লুটিনাইজিং হরমোন)-এর ক্ষরণ সামান্য বৃদ্ধি পায়, ডিম্বাশয়ে ফলিক্সের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় এবং এন্ডোমেট্রিয়াম ১ মিমি. পুরু হয়।

রজ:চক্র এর ধাপ

২। বৃদ্ধি পর্ব:

রজঃচক্রের যে পর্বে জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয় এবং ডিম্বাশয় থেকে সেকেন্ডারী উওসাইট নিষেকের উদ্দেশে বিচ্ছিন্ন হয় (ডিম্বপাত), তাকে বৃদ্ধিপর্ব বলে। এ পর্বের স্থায়িত্বকাল ৭ম থেকে ১৪তম দিন পর্যন্ত। এ সময় বর্ধনশীল ফলিকল কোষ থেকে প্রচুর পরিমাণ ইস্ট্রোজেন হরমোন ক্ষরিত হয়।

এর প্রভাবে এন্ডোমেট্রিয়ামের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় (রক্তবাহিকা ও গ্রন্থিময় কলাসমৃদ্ধ হয়ে উঠে ও প্রায় ৩-৪ মিমি. পুরু হয়, FSH ও LH-এর ক্ষরণ বন্ধ করে দেয় (সম্মুখ পিট্যুইটারির মাধ্যমে), এবং ডিম্বাশয়ের ফলিকল ক্রমশ পরিণত হয়ে উঠে। চক্রের ১২তম দিনে হঠাৎ LH-এর ক্ষরণ বেড়ে যায় এবং ইস্ট্রোজেনের ক্ষরণ কমে যায়।

১৪ দিনের মাথায় (চক্র যদি ২৮ দিনের হয়) পরিণত ফলিকল থেকে ডিম্বপাত ঘটে। ডিম্বপাতের পর ফলিক্সের বাকি কোষগুলো LH- এর প্রভাবে একত্রে কর্পাস ল্যুটিয়াম (corpus luteum) নামক এক বড়, হলদে বস্তুতে পরিণত হয়ে সাময়িকভাবে এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি হিসেবে কাজ করে এবং প্রোজেস্টেরণ হরমোন ক্ষরণ করে। এ হরমোনও এন্ডোমেট্রিয়ামের বৃদ্ধিতে ও ডিম্বপাতে প্রভাব বিস্তার করে। ডিম্বপাতের পরপরই প্রোজেস্টেরণ ক্ষরণে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

৩। প্রাক্-রজঃস্রাবীয় পর্ব :

রজঃচক্রের যে পর্বে ব্লাস্টোসিস্ট ধারণের জন্য জরায়ুর এন্ডোমেট্রিয়াম পূর্ণগঠিত পর্যায়ে অপেক্ষমান থাকে, তাকে প্রাক্-রজঃস্রাবীয় পর্ব বলে। এ পর্বের স্থায়িত্বকাল রজঃচক্রের ১৫-২৮তম দিন পর্যন্ত (অর্থাৎ ১৩-১৪ দিন)-।

এ পর্বে কর্পাস ল্যুটিয়ামের কোষ থেকে প্রচুর পরিমাণ প্রোজেস্টেরণ ও অল্প পরিমাণ ইস্ট্রোজেন ক্ষরণ অব্যাহত থাকে। প্রোজেস্টেরণের প্রভাবে এন্ডোমেট্রিয়াম আরও রক্তবাহিকাসমৃদ্ধ হয়, এর কোষগুলোতে পুষ্টি পদার্থ (গ্লাইকোজেন ও লিপিড) বেড়ে যায়। পরিশেষে এন্ডোমেট্রিয়াম ৫-৬ মিমি. পুরু হয়ে ব্লাস্টোসিস্টের ধারণ ও পোষণে সক্ষম হয়।

৪। রজঃস্রাবীয় পর্ব (Menstrual / Destructive / Bleeding phase):

ডিম্বপাতের পর ডিম্বাণু ৩৬ ঘন্টার মধ্যে নিষিক্ত না হলে কর্পাস ল্যুটিয়াম থেকে নিঃসৃত ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরণের প্রভাবে সম্মুখ পিট্যুইটারি গ্রন্থি FSH ও LH ক্ষরণ বন্ধ করে দেয়। LH (ল্যুটিনাইজিং হরমোন)-এর অভাবে কর্পাস ল্যুটিয়ামের কর্মতৎপরতা বন্ধ হয়ে বিদ্ধস্ত হয়। চক্রের এ পর্বে ৪টি হরমোনের (ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরণ, ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন ও ল্যুটিনাইজি হরমোন) ক্ষরণ মাত্রাই নিম্নতম পর্যায়ে থাকে। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরণের ক্ষরণমাত্রা কমে যাওয়ায় এন্ডোমেট্রিয়ামের আর বৃদ্ধি ঘটে না, বরং তা ভাঙতে শুরু করে।

রক্তের অভাবে তখন এন্ডোমেট্রিয়ামের ধমনীকুন্ডলী প্রসারিত হয়, ফলে ধমনিকা ও কৈশিকজালিকা ভিন্নভিন্ন হলে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে অবশ্য কিছু রক্তবাহিকার সংকোচনে স্থানীয় রক্তপাত বন্ধ হয়, কিন্তু অন্যান্য রক্তবাহিকার অক্ষমতার জন্য রক্তক্ষরণ ৪-৫ দিন স্থায়ী হয়। এ সময় রক্তের সাথে এন্ডোমেট্রিয়াম, রক্তবাহিকার ভগ্নাংশ ও অনিষিক্ত ডিম্বাণু যোনিপথে নিষ্কাশিত হয়।

এসব পদার্থকে রজঃস্রাব বলে। প্রত্যেক রজঃস্রাবের পরিমাণ ৩০-৪০ মিলিলিটার। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরণের ক্ষরণমাত্রা অনেক নিচে নেমে গেলে সম্মুখ পিটুইটারি গ্রন্থির উপর নিয়ন্ত্রণ কমে যায়, তখন আবার FSH ও LH ক্ষরণ শুরু হয়। সে সাথে শুরু হয় নতুন রজঃচক্র সৃষ্টির তৎপরতা।

রজঃচক্র নিয়ন্ত্রণে হরমোনের ভূমিকা

গোনাডোট্রফিন হরমোন মস্তিষ্ক উৎপাদিত হয় । এটি ফলিকল উদ্দীপক হরমোন (FSH), ল্যুটিনাইজিং হরমোনের(LH) উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে । FSH বা ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন মস্তিষ্কে উৎপাদিত হয় এবং ডিম্বাশয়গুলিতে  ডিম্বাণু পরিপক্ক হওয়ার জন্য দায়ী ।

পিটুইটারি গ্রন্থিতে উৎপাদিত ল্যুটেনাইজিং হরমোন ডিম্বাণুকে মুক্ত করার জন্য ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করে । ডিম্বাশয় ইস্ট্রোজেন তৈরি করে যা ডিম্বাণু সৃষ্টির জন্য কাজ করে। প্রোজেস্টেরোন হরমোন ডিম্বাশয় দ্বারা উৎপাদিত হয়,রজঃচক্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পাশাপাশি গর্ভাবস্থার জন্য প্রস্তুতির জন্য কাজ করে।

Leave a Comment